ঢাকা: ঈদুল আজহার ছুটি শেষ হলেও রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বেচাকেনা। অনেক দোকান বন্ধ, ক্রেতার উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কিছু সবজির দামে সামান্য পরিবর্তন এলেও অধিকাংশ পণ্যের দাম ঈদের আগের অবস্থানেই রয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নবোদয়, কৃষি মার্কেট, শ্যামলী ও আদাবর এলাকার কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
ক্রেতা কম, দোকানও অর্ধেক খোলা
ঈদের পরপরই অনেক ব্যবসায়ী এখনও গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরেননি। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দোকান খোলার হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম। নবোদয় বাজারে প্রায় ৫০টির মতো দোকান থাকলেও খোলা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫টি।
বাজারে ঘুরে দেখা যায়, অনেক বিক্রেতা সবজিতে পানি ছিটিয়ে সতেজ রাখার চেষ্টা করছেন। ক্রেতা কম থাকায় বিক্রি তুলনামূলক ধীর গতিতে চলছে।
মোহাম্মদপুরের এক সবজি বিক্রেতা বলেন, “ঈদের পরের দুই-তিন দিন বাজার সাধারণত একটু ফাঁকা থাকে। অনেক পরিবার এখনও ঈদের কেনাকাটা ও অতিথি আপ্যায়নের খাবার ব্যবহার করছে, তাই বাজারে আসার প্রবণতা কম।”
পটলের দামে স্বস্তি
বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে পটলের দাম। ঈদের আগে ভালো মানের পটল যেখানে ১২০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে, সেখানে এখন সেই একই পটল ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে এবং চাহিদা কম থাকায় দাম নেমেছে।
নবোদয় বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, “ঈদের আগে মানুষ বেশি কেনাকাটা করে। তখন দামও একটু বাড়ে। এখন ক্রেতা কম, তাই পটলের দাম কিছুটা কমেছে।”
তবে সব ধরনের পটলের দাম এক নয়। বাজারভেদে সাধারণ মানের পটল ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি এবং উন্নত মানের পটল ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য সবজির দাম প্রায় অপরিবর্তিত
পটল ছাড়া অধিকাংশ সবজির দাম বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে—
- ঢেঁড়স: ৫০–৬০ টাকা কেজি
- ধুন্দল: ৫০–৬০ টাকা কেজি
- করলা: ৬০–৭০ টাকা কেজি
- কাকরোল: ৭০–৮০ টাকা কেজি
- বরবটি: ৮০ টাকা কেজি
- শসা: ৪০–৬০ টাকা কেজি
- লাউ: ৪০–৬০ টাকা প্রতি পিস
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পরিবহন খরচ এবং পাইকারি বাজারের দামের কারণে খুচরা বাজারে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি।
কাঁচা মরিচের দামে বড় পার্থক্য
সবজির বাজারে সবচেয়ে বেশি দামের পার্থক্য দেখা গেছে কাঁচা মরিচে।
একই এলাকায় এক দোকানে কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি হতে দেখা গেলেও অন্য দোকানে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, মরিচের মান, উৎস এবং সরবরাহের তারতম্যের কারণে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এক ক্রেতা বলেন, “এক বাজারে ১৬০ টাকা, আরেক বাজারে ৮০ টাকা—সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি বিভ্রান্তিকর।”
শাকের বাজার স্থিতিশীল
শাকের দামে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বর্তমানে বাজারে—
- পাটশাক: ২০ টাকা আটি
- লালশাক: দুই আটি ৩০ টাকা
- লাউশাক: ৩০ টাকা আটি
- পুঁইশাক: ৩০ টাকা আটি
বিক্রেতারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় শাকের সরবরাহ মোটামুটি ভালো রয়েছে। ফলে দাম স্থিতিশীল আছে।
বাজারভেদে দামের পার্থক্যের কারণ কী?
ক্রেতাদের একটি বড় অভিযোগ হলো একই পণ্যের দাম বিভিন্ন বাজারে ভিন্ন হওয়া।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—
প্রথমত, সব ব্যবসায়ী একই উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন না। কেউ সরাসরি পাইকারি বাজার থেকে আনেন, আবার কেউ মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে সংগ্রহ করেন।
দ্বিতীয়ত, দোকান ভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং বিক্রির পরিমাণও দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত, কিছু বাজারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় থাকলেও অনেক বাজারে প্রত্যেকে নিজের মতো করে দাম নির্ধারণ করেন।
ফলে একই এলাকায়ও এক দোকান থেকে আরেক দোকানে দামের পার্থক্য দেখা যায়।
ফলের বাজারেও ভিন্ন চিত্র
সবজির পাশাপাশি বাজারে এখন মৌসুমি ফলের উপস্থিতিও বেড়েছে।
আম, লিচু, জামসহ বিভিন্ন ফল বিক্রি হতে দেখা গেছে। ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমের কারণে সরবরাহ বাড়ছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহে দাম আরও কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষ করে দেশি আম ও লিচুর চাহিদা বর্তমানে বেশি থাকলেও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না।
সামনে দাম কমার সম্ভাবনা আছে কি?
ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সব দোকান খুলে গেলে এবং সরবরাহ আরও স্বাভাবিক হলে কিছু সবজির দাম কমতে পারে।
বিশেষ করে পটল, শসা, ধুন্দল ও লাউয়ের মতো মৌসুমি সবজিতে আরও কিছুটা মূল্যহ্রাস দেখা যেতে পারে।
তবে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সরবরাহের ওপর নির্ভর করবে।
ক্রেতাদের পরামর্শ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেতাদের উচিত একটি বাজারের ওপর নির্ভর না করে আশপাশের কয়েকটি বাজারে দাম যাচাই করে কেনাকাটা করা।
বর্তমানে একই পণ্যে ২০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, যা মাসিক খরচে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় আনতে পারে।
সব মিলিয়ে ঈদের পর রাজধানীর বাজারে ক্রেতা ও দোকানদার কম থাকলেও সবজির দামে বড় কোনো স্বস্তি এখনও আসেনি। তবে পটলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে।
